24.2 C
Dinājpur
Thursday, December 1, 2022

নিজের পায়ে দাঁড়ানো শিউলির গল্প

অবশ্যই পরুন

মোঃ রুবাইয়াদ ইসলাম হাবিপ্রবি‌ (দিনাজপুর) :

শিউলি আক্তার পপি। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী। শিউলি নীলফামারীর মেয়ে। সে অনলাইনে “শিউলিকানন” নামে একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তরুণ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

শিউলি তার নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করার ব্যাপারে বলেন, আমার এক বান্ধবীর নাম তিশা। তিশা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। তার মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশের নামকরা অনলাইন প্লাটফর্ম “Women & E-commerce Forum”-এ যুক্ত হই। তারপর সেখানে অনেক পোস্ট চোখের সামনে ভেসে আসতো। নানান রকম ছবি দেখতাম; যেগুলো আমাদের দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে।‌ আমি গ্রুপ টাকে অনুসরণ করা শুরু করলাম। সেখানে দেখতাম আপুরা অনেক ভালো পণ্য নিয়ে পোস্ট করতো‌। যেগুলো অনলাইনে বিক্রি হয় দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। আরও বেশি বিস্মিত হতাম‌ বাংলাদেশের নারীরা এখন অনলাইন প্লাটফর্মে কাজ করছে দেখে। নিজের প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাচ্ছে। সেখান থেকে আমিও অণুপ্রাণিত হই এবং মনে মনে ঠিক করি, আমিও একজন উদ্যোক্তা হবো।

শিউলি বলেন, আমি দেখতাম আপুরা ছাতু, বাদাম, পেলকা, মরিচ গুড়া, পেঁয়াজ, হাতের কাজের জামা, শাড়ি, রান্নার জিনিসপত্র সহ নানা রকম পণ্য অনলাইনে খুব সহজেই বিক্রি করতেন। সে সময় করোনা মহামারী, দেশের পরিস্থিতি একদম প্রতিকূলে। পরিবারের সাথে এ বিষয়ে আলাপ করলে তারা অসম্মতি জানায়।

শিউলি তার প্রথম প্রতিবন্ধকতার কথা জানান, আমি গ্রামে থাকি। বাবা বলেন, মানুষ বলবে এতো টাকা পয়সা শেষ করে এখন কিছু করতে না পেরে ব্যবসা করবে। আমি চাই না কেউ আমাকে বা আমার মেয়েকে আঙ্গুল তুলে কিছু বলুক। ব্যবসা শুরু করার জন্য ইনভেস্ট যে করব সে উপায় একদম ছিলো না আমার, পরিবার থেকেও সাপোর্ট দেয়নি। ভাবলাম, প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু টাকা জমিয়ে কাজটা শুরু করব। সে সময় বাসায় কিছু ছেলে মেয়েকে পড়াবো; সেটাকেও সমর্থন করছিলেন না আমার বাবা। মাকে বলে রাজি করাই। কিন্তু টাকা আর জমা হয় না। কোনো না কোনোভাবে খরচ হয়ে যায়।

শিউলি তার উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রচেষ্টার কারণ হিসেবে বলেন, পরিবারের বড় সন্তান আমি, বাবা একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি ছিলেন। করোনার কারনে বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলে বাসার একটু খারাপ অবস্থা। প্রতিটা মুহুর্ত মনে হয়, আমার কিছু করা দরকার। কিছু করতে চাই। আল্লাহর কাছে আমি সবসময় চাইতাম, আমাকে একটা উপায় দিয়ে দিতে যাতে আমি আত্মনির্ভরশীল হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি। একবার নানুর বাসায় গেলাম বেড়াতে। ছোট মামার কাছে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি আমাকে সমর্থন দেন। বলেন শুরু করো, আশা করছি ভালো কিছু হবে। আমি সেখানে প্রথম সাহসটা পাই। উদ্যোগটা শুরু করার জন্য আমি অনেক বেশি অস্থির ছিলাম। নানুর বাসায় গিয়ে পরের দিন আবার বাসায় চলে আসি। উদ্যোগ শুরু করব; কিন্তু হাতে টাকা ছিলো না। ভাবছিলাম কারো কাছে কিছুদিনের জন্য ধার নিবো। আমার ডিপার্টমেন্টের এক ব্যাচ বড়ো ভাইয়ার সাথে আমি বিষয়টা ভাগাভাগি করি এবং ৩০০০ টাকা ধার নেই। সময় নেই ১৫ দিনের জন্য। আমার এতো দূর আশার শুরুটার পিছনে উনার অবদান অনেক ছিলো। শুরু করলাম “উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শিদল” দিয়ে। প্রথম দিনেই আমি অনেক রেসপন্স পেলাম এবং আমার ৩৫০০ টাকার শিদলের অর্ডার আসে। বিজনেসের শুরুতে নাকি একটু হতাশা কাজ করে, বিক্রি কম হয়‌‌। এসব মোটেই আমাকে দেখতে হয়নি। প্রথম দিক থেকেই বিক্রি ভালো হয়। ধীরে ধীরে আমি টাঙ্গাইলের শাড়ি, পাঞ্জাবি, বোরকা, প্রাকৃতিক চাকের মধু যুক্ত করি। আমার পেজ থেকে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শিদল, প্রাকৃতিক চাকের ১০০% খাঁটি মধু। যেগুলো আমার পেজের সিগনেচার প্রোডাক্ট। এছাড়াও শাড়ি সহ মোটামুটি সবকিছুই বিক্রি হয়। আমার প্রতিটা কাস্টমার রিপিট হয় এবং রিপিট কাস্টমাররাই নতুন কাস্টমার এনে দেন। আমার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু-বান্ধবী, বড় ভাইয়া-আপু, আমার আত্নীয়রা কেনাকাটা করে। আমার কাছ থেকে বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪ টা জেলার মানুষ কেনাকাটা করে এবং দেশের বাহিরে থেকেও অর্ডার আসে। আমি আমার বিজনেস একা পরিচালনা করি। ডেলিভারি থেকে শুরু করে সব। তবে মা-বাবা সহ পরিবারের সবাই এখন মাঝে মধ্যে আমাকে সাহায্য করেন।

শিউলি তার বাঁধার কথা জানান, যেকোনো কাজের বাধা থাকে, আমার ক্ষেত্রেও কম নয়। পারিবারিক, সামাজিক সব দিক দিয়েই অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হয়। গ্রামে থাকি। অনেকের মুখে শুনি মেয়ে হয়ে ব্যবসা করো। আর দুনিয়াতে কোন কাজ নেই। আবার বলে, এতো টাকা পয়সা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে কি হলো, শেষমেষ এই অবস্থা। অনেক সময় পরিবারের সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়। আমি স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে বুঝাই। তবে দিনশেষে, পরিবারই আমার পাশে থাকে।

শিউলি তার প্রথম বাস্তব অভিজ্ঞতা জানান, আক্ষেপের কথা বলে শেষ করা য়াবে না। উদ্যোগ শুরু করার পর একদিন আমি হাফ সিল্ক শাড়ির অর্ডার নেই। রংপুরের এক আপু আমার কাছ থেকে ৪টা শাড়ি অর্ডার করে। আগাম কিছু টাকা চাইলে আপু বলেন, আমি তোমার এলাকার। আমি পণ্যটি অবশ্যই নিবো। এমন আন্তরিকতা দেখায় যে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে অর্ডার নেই। শাড়ি আসার পর উনাকে নক করলে উনি আমাকে ফেসবুকে ব্লক করে। প্রথম দিকের এ ঘটনাটা মনে রাখার মতো। এটা খুব বড় ধরনের একটা ধাক্কা ছিলো আমার জন্য।

- Advertisement -spot_img

আরো নিবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ সংবাদ